শাইখ সানাউল্লাহ অমৃতসরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী Shaikh sanaullah Amritsari

 



etoSosndrpm4agt54h8t416cl014শাইখ সানাউল্লাহ অমৃতসরী (রাহিমাহুল্লাহ) ’র সংক্ষিপ্ত জীবনী
জন্ম ও পরিচয়:
তিনি হলেন যুগশ্রেষ্ঠ মুনাযির ভারতীয় উপমহাদেশে আহলুস সুন্নাহর শ্রেষ্ঠ মুজাহিদ শেরে পাঞ্জাব ফাতিহে ক্বাদইয়ান আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ আল-মুহাদ্দিসুল ফাক্বীহ আল-মুফাসসিরুল মুতক্বিন ইমাম আবুল ওয়াফা সানাউল্লাহ অমৃতসরী।
তিনি ১২৮৫ হিজরী সনে ভারতের অমৃতসর শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
‘ইলম অর্জন:
শাইখ ১৪ বছর বয়সে পিতামাতা উভয়কে হারান। এরপর তিনি ‘ইলম অর্জন শুরু করেন এবং দ্বীনী জ্ঞানে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি কানপুর প্রদেশে ‘ইলম অর্জন করেন এবং নিজের এলাকা অমৃতসরে ফিরে আসেন। তিনি তৎকালীন সময়ের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুসনিদ মিয়াঁ সাহেব খ্যাত ইমাম নাযীর হুসাইন দেহলবী (রাহিমাহুল্লাহ) ’র সেরা ছাত্রদের একজন ছিলেন।
কর্মজীবন:
১৩১০ হিজরী থেকে তিনি দারস প্রদানের কাজে ব্যাপৃত হন এবং ভ্রষ্ট ফিরক্বাহর লোকদের সাথে মুনাযারাহ (বিতর্ক) ও তাদেরকে রদ করার প্রতি গুরুত্ব দেন।
এই সময় তিনি পথভ্রষ্ট ফিরক্বাহগুলোকে রদ করে অসংখ্য অমূল্য গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।
১৩২৪ হিজরী সনে দিল্লিতে অল ইন্ডিয়া আহলেহাদীস প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর সম্পাদক নিযুক্ত হন। আর অল ইন্ডিয়া আহলেহাদীস কনফারেন্সের সভাপতি নিযুক্ত হন হাফিয ‘আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রাহিমাহুল্লাহ) এবং কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন সুনানে আবূ দাউদের বিখ্যাত ভাষ্যগ্রন্থ ‘আওনুল মা‘বূদ এর প্রণেতা আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ আল-মুহাদ্দিসুল ফাক্বীহ ইমাম শামসুল হাক্ব ‘আযীমাবাদী (রাহিমাহুল্লাহ)।
ভারত বিভক্তির আগ পর্যন্ত শাইখ অমৃতসরী কনফারেন্সের সম্পাদক হিসেবে বহাল ছিলেন।
তিনি ভণ্ডনবী মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর সাথে মুনাযারাহ করেন এবং তাকে পরাভূত করেন। মির্যাকে রদ করে তিনি অনেকগুলো গ্রন্থও প্রণয়ন করেন। মূর্খ ও মহামিথ্যুক মির্যা শাইখের সাথে মুবাহালা করে এবং স্পষ্টভাবে বিবৃতি দেয় যে, তাদের মধ্যে যে মিথ্যুক সে সত্যবাদীর জীবদ্দশায় মারা যাবে। ফলে আল্লাহর ইচ্ছায় মহামিথ্যুক দাজ্জাল মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী কিছুদিন পরই মারা যায়। সে মারা যাওয়ার পর শাইখ অমৃতসরী (রাহিমাহুল্লাহ) প্রায় ৪০ বছর জীবিত ছিলেন।
ভারতবর্ষে ইসলামের জন্য তাঁর খেদমত ছিল অসাধারণ। মুনাযারাহ করতে এসে তাঁর কাছে পরাজিত হয়েছে হিন্দু, খ্রিস্টান, কাদিয়ানী, ক্ববরপূজারী সহ অসংখ্য বিদ‘আতী ও খুরাফী ফিরক্বাহ।
তাঁর মত একজন ‘ইলমী ব্যক্তিত্ব স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে আসমা ওয়াস সিফাত সংক্রান্ত ‘আক্বীদাহয় ভুল করেন। সাথে সাথে সমসাময়িক ভারতের প্রখ্যাত ‘আলিম শাইখ ‘আব্দুল জাব্বার বিন ‘আব্দুল্লাহ গজনভী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁকে রদ করে বই লিখেন। বইয়ের নাম “আল আরবা‘ঈন ফী আন্না সানাআল্লাহ্ লাইসা ‘আলা মাযহাবিল মুহাদ্দিসীন”। তাঁর এই যথার্থ রিফিউটেশনকে সমর্থন করেন তৎকালীন ভারতের আহলুল হাদীস কিবারুল ‘উলামা। পরবর্তীতে বাদশাহ ‘আব্দুল ‘আযীয আলুস সা‘ঊদ (রাহিমাহুল্লাহ) ’র মধ্যস্থতায় তিনি তাঁর ভুল অবস্থান থেকে ফিরে আসেন। ফালিল্লাহিল হামদ।
[দ্র.: আল-হারাকাতুস সালাফিয়্যাহ ফিল হিন্দ ওয়া দাওরুহা ফী খিদমাতিস সুন্নাতিল মুত্বাহহারাহ; পৃষ্ঠা: ১৪৩-১৫৬]
লিখনী:
শাইখের লেখা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল—
(১) জাওয়াবাতুন নাসারা
(২) আত-তাওহীদ ওয়াত তাসলীস ওয়া ত্বারীক্বুন নাজাহ
(৩) আল-ইসলাম ওয়াল মাসীহিয়্যাহ
(৪) আল-ইসলাম ওয়াস সিয়াসাহ
(৫) হুদূসুল ওয়াইদ
(৬) গাযউয়ুল জুয়ূশিল ইসলামিয়্যাহ ‘আলাল আরিয়াহ
(৭) তাগলীবুল ইসলাম
(৮) আল-কিতাবুল ইলহামী
(৯) বাহসুত তানাসুখ
(১০) উসূলুল আরিয়াহ
(১১) ইযহারুল হাক্ব
(১২) শাহাদাতুল মির্যা
(১৩) ‘আক্বাইদুল মির্যা
(১৪) তারীখুল মির্যা
(১৫) আবাত্বীলুল মির্যা
(১৬) আত-তুহফাতুল আহমাদিয়্যাহ
(১৭) মুলকুল ইনজিলতারা ওয়াল মির্যা ক্বাদিয়ানী
(১৮) খাতমুন নুবুওয়্যাহ
(১৯) তাফসীরুল ক্বুরআন বি কালামির রাহমান
(২০) নাযরাতুন ‘আলাল হারাকাতিল ওয়াহহাবিয়্যাহ
শাইখ সানাউল্লাহর ব্যাপারে শাইখ রাবী‘র প্রশংসা:
বর্তমান যুগে জারাহ ও তা‘দীলের ঝাণ্ডাবাহী মুজাহিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ আল-মুহাদ্দিস ইমাম রাবী‘ বিন হাদী বিন ‘উমাইর আল-মাদখালী (হাফিযাহুল্লাহ) বলেছেন,
শাইখ সানাউল্লাহ অমৃতসরী (রাহিমাহুল্লাহ) ভারতীয় ‘আলিম ছিলেন। হিফযশক্তি ও ফিক্বহশক্তিতে তিনি ছিলেন ইবনু তাইমিয়্যাহর সদৃশ। মুনাযারাহয় কেউ তাঁর সাথে মোকাবেলা করতে পারত না, চাই সে হিন্দু হোক বা খ্রিষ্টান, খুরাফী (কুসংস্কারপন্থী), ক্ববরপূজারী হোক। আল্লাহ তাঁর হাতে অসংখ্য লোককে হিদায়াত দিয়েছেন। ফিতনাহর শীর্ষনেতারা বর্মাচ্ছাদিত হয়ে সঙ্কটাবস্থায় পতিত হয়েছিল। তারা তাঁর বিরুদ্ধে এক জাহিলকে নিয়োগ করে।
সেই জাহিল লোক তাঁর মাথায় কুঠার দিয়ে আঘাত করে, ফলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। সে তাঁকে মরণআঘাত করে, যার ফলে তিনি বেহুঁশ হয়ে যান। ওই লোককে পাকড়াও করে জেলখানায় পাঠানো হয়। যখন শাইখ জ্ঞান ফিরে পান, তখনই তিনি বলে উঠেন যে, আমাকে আঘাতকারী লোকটি কোথায় ? পার্শ্বস্থ লোকেরা বলল, সে তো জেলখানায়। তিনি বললেন, তাকে কারাবন্দী করে রাখা আমি কখনোই পছন্দ করব না, আমি চাই তাঁকে কারাগার থেকে বের করা হোক।
প্রশাসন তাকে জেলখানা থেকে মুক্তি দিতে অস্বীকার করে। তখন শাইখ জেলাখানায় ওই লোকের খরচ বহন করেন এবং লোকটির পরিবারের খরচও বহন করেন। এ এক অচিন্তনীয় বিষয়, অকল্পনীয় কর্ম! কোথায় গেল হিংসা-বিদ্বেষ, আর কোথায় গেল প্রতিশোধস্পৃহা ? কোথায় ? এই তো ইসলাম, ইসলামের প্রতি ভালোবাসা। এই তো উন্নত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। এগুলো এখন বিদায় নিয়েছে, এগুলো এখন বাষ্পীভূত হয়েছে।
এরপর লোকটিকে যখন জেলখানা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়, তখন একজন নেতা লোকটির কাছে এসে নিজেদের ওজর-আপত্তি পেশ করে। লোকটি ঐকান্তিকভাবে সালাফী মানহাজে প্রবেশ করে। যদি তিনি বলতেন, তোমরা ওকে কারাবন্দী করো, মারপিট করো। আমার অধিকার গ্রহণ করো। আল্লাহর ক্বসম, আমি আমার অধিকার ছাড়া আর কিচ্ছু চাই না। তবে এর প্রভাবটা কেমন হতো, মন্দ প্রভাব ছাড়া ?
[২১ রামাদ্বান, ১৪২৬ হিজরী তারিখের একটি সাক্ষাৎকার]
মৃত্যু:
শাইখ তাঁর শেষ জীবনে শিখ ও হিন্দুদের অত্যাচারে ভারত ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। তিনি পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থান করেন। এটা ভারত বিভক্তির পরের ঘটনা। শাইখ লাহোরেই ১৩৬৭ হিজরী সনে অসংখ্য ভক্তকে রেখে পরলোকগমন করেন। আল্লাহ শাইখকে তাঁর খাস রহমত দিয়ে ঢেকে দিন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে উঁচু মাক্বাম দান করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল ‘আলামীন।
বি.দ্র.: আমাদের নিবন্ধটি উল্লিখিত আর্টিকেল থেকে সংগৃহীত, সংক্ষেপিত এবং ঈষৎ পরিমার্জিত।
অনুবাদক: মুহাম্মাদ ‘আব্দুল্লাহ মৃধা

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.

.....www.SharifAhmedSourav.blogspot.com