দাড়িয়ে পানি পান করার বিধান

 


প্রশ্ন: দাঁড়িয়ে পানি পান করা কি বৈধ?দাড়িয়ে পানি পান করলে কি গুনাহ হবে?শার'ঈত কি বলে এ ব্যাপারে? 

▬▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর : দাঁড়িয়ে পানি পান করার বিষয়টি রাসুল (ﷺ) একাধিকবার নিষেধ করেছেন। সুতরাং, উত্তম হচ্ছে বসে পানি পান করা,দাঁড়িয়ে পান না করা।তবে সাহাবা কেরাম হাঁটাচলা অবস্থায় পানি পান করতেন এবং খেতেন। যদি কোনো প্রয়োজন দেখা দেয়,তাহলে দাঁড়িয়ে পান করতে পারবেন।কিন্তু অপ্রয়োজনে বসে পান করবেন,দাঁড়িয়ে পান করবেন না।পানি পান করার সুন্নাহ এবং আদব হলো,বসে পান করা।নিম্নে আলোচনা করো হলো:-

🔶দাড়িয়ে পান করার নিষেধ প্রসঙ্গে। 

✧═══•❁•═══✧

▪️আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

لَا يَشْرَبَنَّ أَحَدٌ مِنْكُمْ قَائِمًا فَمَنْ نَسِيَ مِنْكُمْ فَلْيَسْتَقِئْ-

 তোমাদের কেউই যেন দাঁড়িয়ে পান না করে। যদি কেউ ভুলবশতঃ এরূপ করে, সে যেন বমি করে ফেলে। (মুসলিম)[সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্,হা/৭৭১৮,আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী,হা/১৫০৩৭]ব্যাখ্যাঃ উক্ত হাদীসের মধ্যে দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করা হয়েছে। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীসের মধ্যে যমযমের পানি এবং ওযূর অবশিষ্ট পানি দাঁড়িয়ে পান করার কথা উল্লেখ রয়েছে। এ দুইটি পরস্পর হাদিস বিরোধের সমাধানে ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ দাঁড়িয়ে পান করা নিষেধের হাদীস মাকরূহে তানযীহীর উপর প্রযোজ্য, আর দাঁড়িয়ে পান করা (সম্পর্কিত হাদীস) হচ্ছে জায়িযের উপর প্রযোজ্য।(فَمَنْ نَسِيَ مِنْكُمْ فَلْيَسْتَقِئْ) এখানে ভুলে দাঁড়িয়ে পান করলে বমি করে ফেলার নির্দেশ ওয়াজিব নয়, বরং মুস্তাহাব। যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে পান করল তার ওপর মুস্তাহাব হলো বমি করে ফেলা। দলীল স্বরূপ এ সহীহ হাদীসটি। কেননা হাদীসটি কোন ওযরে ওয়াজিব না হলে মুস্তাহাব হবেই। ছিলেন। (শারহুন নাবাবী: ১৩শ খন্ড, হাঃ ২০২৪)

▪️উপরোক্ত বমি করা সংক্রান্ত হাদীসটির হুকুম সম্পর্কে অধিকাংশ আহালুল আলেমগন বলেছেন, এই হাদীসটি মানসূখ হয়ে গেছে। কারন একাধিক হাদীস দ্বারা প্রমানিত রাসূল ﷺ দাড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন আবার কিছু হাদীস থেকে বুঝা যায় রাসূল ﷺ দাঁড়িয়ে পান করেছেন। দুই রকম হাদীসের মধ্যে সমন্বয় হল বিনা ওজরে দাঁড়িয়ে পান করা সমুচীন নয় বরং সুন্নাহ পরিপন্থী। তবে ওজর বসত বসে পান করার জায়গা না থাকলে দাঁড়িয়ে পান করা যায়। (সিলসিলা সহিহাহ, হা/১৭৫)

▪️রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে পান করতে দেখে বললেন, ‘বমি করে ফেলে দাও।’সে বলল, ‘কেন?’

 তিনি বললেন, ‘তুমি কি পছন্দ করো যে তোমার সঙ্গে বিড়াল পান করবে?’ সে বলল, ‘না।’ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘এর চেয়েও মন্দ কেউ?অর্থাৎ শয়তান তোমার সঙ্গে পান করেছে।’তাই হাদিসের নির্দেশনা মোতাবেক স্বাভাবিক অবস্থায় বসেই পানাহার করতে হবে।অবশ্য বিশেষ পরিস্থিতিতে যেখানে বসে পানা-হারের কোনো ব্যবস্থা নেই কিংবা বসে খাওয়া বা পান করতে সমস্যা সে ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে পানাহার করা যাবে।কেননা প্রয়োজনবশত দাঁড়িয়ে পান করার কথাও হাদিসে আছে।(ফাতহুল বারি, খন্ড: ১০ পৃষ্ঠা: ৮৫-৮৬)

🔶দাড়িয়ে পান জায়েজ সম্পর্কে। 

✧═══•❁•═══✧

▪️আয়শা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (সা.)-কে দাঁড়িয়ে ও বসে পানি পান করতে, খালি পায়ে ও জুতা পরিহিত অবস্থায় সালাত আদায় করতে এবং সালাত শেষে তাঁর ডানদিক থেকে ও বামদিক থেকে ফিরে বসতে দেখেছি

(সুনানে আন-নাসায়ী:১৩৬১)ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে পান করেছেন জীবনে একবার অথবা দু’বার বৈধতার জন্য অথবা স্থানের অসুবিধার জন্য আর বসে সর্বাবস্থায় পান করেছেন এবং যা উত্তম অভ্যাস। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)

▪️কাবশা (রাঃ) বলেন, রাসূল (সা.) আমার ঘরে আসলেন, তিনি দাঁড়িয়ে থাকাবস্থায় একটি ঝুলন্ত মশকের মুখ হতে পানি পান করলেন। আমি পরে উঠে গিয়ে মশকের মুখের সেই অংশ (বারকাতের আশায়) কেটে রেখে দেই।(তিরমিজি হা/১৮৯২,ইবনে মাজাহ হা/ ৩৪২৩;মিশকাত:৪২৮১;(বুখারী:৫৬১৫)]দাঁড়িয়ে পানি পান করাকে অনেকে খারাপ মনে করে।কিন্তু দাঁড়িয়ে পানি পান করা সবসময়ই জায়েজ।এছাড়াও,,"ইবনু উমার (রাঃ) বলেন, রাসূল ﷺ-এর যামানায় আমরা হাঁটতে হাঁটতে খাবার খেতাম এবং দাঁড়িয়ে থাকাবস্থায় পানি পান করতাম।(তিরমিজি হা/১৮৮০,মিশকাত,হা/৪২৭৫)ব্যাখ্যাঃ হাদীস প্রমাণ করে দাঁড়িয়ে খাওয়া বৈধ কোন প্রকার অপছন্দ ছাড়াই তা রসূলুল্লাহ ﷺ-এর ‘আমল এবং তাকরীর দ্বারা প্রমাণিত। তবে ‘উলামাদের নিকট ভালো হলো চলন্ত, হাঁটা ও দাঁড়ানো অবস্থায় না খাওয়া যা ইবনু মালিক স্পষ্ট করেছেন। ইতিপূর্বে দাঁড়ানো অবস্থায় পান করার আলোচনা গেছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)

▪️ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পান করা যে জায়েয, সেটা বুঝানোর জন্যই রাসূল (ﷺ) এরূপ করেছেন (ফাৎহুল বারী হা/২৬১৫-১৬-এর আলোচনা)। ইমাম নববীও একই মন্তব্য করেছেন (শরহ নববী হা/২০২৭-এর আলোচনা)।

➡️দুইটা হাদিসের সমন্বয়। 

✧═══•❁•═══✧

▪️আত তাহাবী (রহঃ) বলেন:বর্ণিত হয়েছে যে, শা'বি বলেছেন: দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পান করা কেবল এই জন্যেই অপছন্দনীয় যে তা ক্ষতিকর। আর শা'বি অবৈধ হওয়ার কারণ উল্লেখ করেছেন: কারণ এর(দাঁড়িয়ে পান) ফলে  ক্ষতি এবং রোগ হওয়ার ভয় আছে, আর কিছু না(অন্য কারণ নেই)।এটি নিষেধ করার ক্ষেত্রে, আল্লাহর রসূল ﷺ-অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তাঁর উম্মতের প্রতি সহানুভূতির কারণে  আর তাদেরকে ধর্মীয় ও পার্থিব উভয় ক্ষেত্রেই যা তাদের জন্যে সর্বোত্তম তা করতে বলতে চেয়েছিলেন যেমনটি তিনি তাঁদের বলেছিলেন, "আর আমার ক্ষেত্রে, আমি হেলান দিয়ে খাই না।"তার মানে এই নয় যে, এটা করা তাদের জন্য হারাম, বরং এর অর্থ এই যে, হেলান দিয়ে খাওয়া হলে তাদের জন্য কিছু ভয়ের কারণ আছে। শা'বি কারণ উল্লেখ করেছেন যে কেন আল্লাহর রসূল ﷺ-হেলান দিয়ে খাওয়া অপছন্দ করতেন এবং এই অপছন্দ হওয়াটা কেবল এজন্যে যে শেষ পরিণতি (হেলান দিয়ে খাওয়ার) কী হয়, যেমন পেট বড় হয়ে যাওয়া।একই বিষয় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পান করা নিষেধ সম্পর্কে তাঁর থেকে যা বর্ণিত হয়েছে তার ক্ষেত্রেও সত্য। এটি কেবল এইজন্যে যে ফলাফল কী হতে পারে তার কারণে এবং তিনি এই কারণেই এটি অপছন্দ করেছেন এবং অন্য কিছু নয়।[শরহেমা'আনিল আছার-খন্ড: ৪ পৃষ্ঠা: ২৭৪]

▪️ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন, সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন। সহীহ সূত্রে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, দাঁড়িয়ে পানকারী একজন লোককে বমি করার হুকুম দিয়েছেন। তবে সহীহ সূত্রে এও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি দাড়িয়ে পান করেছেন। এ জন্যই কোন কোন আলেম বলেন- দাঁড়িয়ে পান করার নিষিদ্ধতা রহিত হয়ে গেছে। আরও বলা হয় যে, নিষিদ্ধতা দ্বারা দাঁড়িয়ে পান করা হারাম বুঝা যায়নি (বরং তা ভদ্রতার খেলাফ)। আরও বলা হয়েছে যে, তিনি প্রয়োজন বশতঃ দাঁড়িয়ে পান করেছিলেন।(যাদুল মা‘আদ,খন্ড: ১ পৃষ্ঠা: ১৪৩-৪৪)তিনি আরো বলেন যে, দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পান করার নেতিবাচক প্রভাব এবং বসে থাকা অবস্থায় পান করার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন:দাঁড়িয়ে 

থাকা অবস্থায় পান করার অনেক নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে, যার মধ্যে একটি হল এটি তৃষ্ণা সম্পূর্ণরূপে নিবারণ করে না এবং পেটে স্থির হয় না যাতে লিভার শরীরের অন্যান্য অংশে পুষ্টি বিতরণ করতে পারে। বরং তা দ্রুত ও বল সহকারে পেটে আসে ফলে এতে ঠাণ্ডা বা অশান্তি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে যা ধীরে ধীরে নড়াচড়া না করে দ্রুত শরীরের নিচের অংশে চলে যেতে পারে। এ সবই পানকারীর জন্য ক্ষতিকর, কিন্তু যদি সে মাঝে মাঝে বা প্রয়োজনের সময় তা করে তবে তা তার ক্ষতি করবে না যাদুল-মাআদ,খন্ড: ৪ পৃষ্ঠা: ২২৯)কিন্তু 

দাঁড়িয়ে পানি পান করা উত্তম নয়।যা নিষেধাজ্ঞার হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়।(যাদুল-মাআদ, খন্ড: ১ পৃষ্ঠা: ১৪৯-৫০)

▪️শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রাহি. বলেন,

الشرب قاعدًا أفضل والشرب قائمًا لا بأس به، والحديث الذي فيه الاستقاء منسوخ

(পানি)বসে পান করা উত্তম।দাঁড়িয়ে পান করায় কোনও

 অসুবিধা নেই।আর যে হাদিসে বমি করার কথা এসেছে তা মানসুখ(রহিত)।"(বিন বায অর্গানাইজেশনের ফাতাওয়া নং ১৫৯৬৫)

▪️সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন, মূলনীতি হল: বসে থাকা অবস্থায় পান করা উচিত,

এটিই উত্তম, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পান করা যেতে পারে।নবী (ﷺ) উভয়টিই প্রমান করার জন্য করেছেন যে এ ব্যাপারে কৌশলের অনেক অবকাশ রয়েছে।(ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা,খন্ড:২২ পৃষ্ঠা:১৩৩)

▪️বিগত শতাব্দীতে সৌদি ‘আরবের শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি এবং ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন, বিনা প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে খাওয়া-দাওয়া করা মাকরূহ। (আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা,খন্ড: ৫ পৃষ্ঠা: ৪৭৭;ফাতাওয়া ইবনে বায”খন্ড: ২৫ পৃষ্ঠা: ২৭৬)

পরিশেষে আমরা বলবো, যেকোন ধরনের পানাহার বসে করাই সুন্নাহ সম্মত। (সহীহ মুসলিম হা/২০২৪, মিশকাত হা/৪২৬৬,৬৭)।কারন রাসূল (ﷺ) একাধিক হাদীসে দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন। তবে প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পান করাও জায়েয (আহমাদ হা/৭৯৫, বুখারী হা/৫৬১৫, ইবনু মাজাহ হা/৩৩০১, মিশকাত হা/৪২৭৫)।সুতরাং দাঁড়িয়ে পানি পান করা হারাম- এ কথা বলার সুযোগ নেই। তবে ইসলামি আদব হল বসে পানি পান করা।(তুহফাতুল আহওয়াযী,খন্ড:৫ পৃষ্ঠা: ৫১২; ফাতহুল মুনঈম,খন্ড: ৮ পৃষ্ঠা: ২০৯)

আল্লাহ ভালো জানেন। 

______________________

✍️ Maydul Bin Emdadul Haque

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.

.....www.SharifAhmedSourav.blogspot.com